Showing posts with label সাহিত্যের কথা. Show all posts
Showing posts with label সাহিত্যের কথা. Show all posts

Saturday, December 17, 2011

কাজী নজরুল ইসলাম (মে ২৪, ১৮৯৯ — আগস্ট ২৯, ১৯৭৬) এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

 বাঙালি কবি, সঙ্গীতজ্ঞ, দার্শনিক, যিনি বাংলা কাব্যে অগ্রগামী ভূমিকার জন্য সর্বাধিক পরিচিত। বাংলা ভাষার অন্যতম সাহিত্যিক, দেশপ্রেমী এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ - দুই বাংলাতেই তাঁর কবিতা ও গান সমানভাবে সমাদৃত। তাঁর কবিতায় বিদ্রোহী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাঁকে বিদ্রোহী কবি বলা হয়। তার কবিতার মূল বিষয়বস্তু ছিল মানুষের প্রতি মানুষের অত্যাচার এবং দাসত্বের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ। বাংলা মননে কাজী নজরুল ইসলামের মর্যাদা ও গুরুত্ব অপরিসীম। একাধারে কবি, সাহিত্যিক, সংগীতজ্ঞ, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ এবং সৈনিক হিসেবে অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে নজরুল সর্বদাই ছিলেন সোচ্চার। তাঁর কবিতা ও গানে এই মনোভাবই প্রতিফলিত হয়েছে। অগ্নিবীণা হাতে তাঁর প্রবেশ, ধূমকেতুর মতো তাঁর প্রকাশ। যেমন লেখাতে বিদ্রোহী, তেমনই জীবনে - কাজেই "বিদ্রোহী কবি"।
নজরুল এক দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রাথমিক শিক্ষা ছিল ধর্মীয়। স্থানীয় এক মসজিদে মুয়াজ্জিন হিসেবে কাজও করেছিলেন। বিভিন্ন থিয়েটার দলের সাথে কাজ করতে যেয়ে তিনি কবিতা, নাটক এবং সাহিত্য সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কিছুদিন কাজ করার পর তিনি সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। এসময় তিনি কলকাতাতেই থাকতেন। এসময় তিনি ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। প্রকাশ করেন বিদ্রোহী এবং ভাঙার গানের মত কবিতা; ধূমকেতুর মত সাময়িকী। জেলে বন্দী হলে পর লিখেন রাজবন্দীর জবানবন্দী। এই সব সাহিত্যকর্মে সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা ছিল সুস্পষ্ট। ধার্মিক মুসলিম সমাজ এবং অবহেলিত ভারতীয় জনগণের সাথে তার বিশেষ সম্পর্ক ছিল। তার সাহিত্যকর্মে প্রাধান্য পেয়েছে ভালবাসা, মুক্তি এবং বিদ্রোহ। ধর্মীয় লিঙ্গভেদের বিরুদ্ধেও তিনি লিখেছেন। ছোট গল্প, উপন্যাস, নাটক লিখলেও তিনি মূলত কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত। বাংলা কাব্য তিনি এক নতুন ধারার জন্ম দেন। এটি হল ইসলামী সঙ্গীত তথা গজল। নজরুল প্রায় ৩০০০ গান রচনা এবং সুর করেছেন যেগুলো এখন নজরুল সঙ্গীত বা "নজরুল গীতি" নামে পরিচিত এবং বিশেষ জনপ্রিয়। মধ্যবয়সে তিনি পিক্‌স ডিজিজে আক্রান্ত হন। এর ফলে দীর্ঘদিন তাকে সাহিত্যকর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়। একই সাথে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে ১৯৭২ সালে তিনি সপরিবারে ঢাকা আসেন। এসময় তাকে বাংলাদেশের জাতীয়তা প্রদান করা হয়। এখানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

 জন্ম ও প্রাথমিক জীবন

১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪মে (১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ই জ্যৈষ্ঠ) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। চুরুলিয়া গ্রামটি আসানসোল মহকুমার জামুরিয়া ব্লকে অবস্থিত। পিতামহ কাজী আমিনউল্লাহর পুত্র কাজী ফকির আহমদের দ্বিতীয়া পত্নী জাহেদা খাতুনের ষষ্ঠ সন্তান তিনি। তার বাবা ছিলেন স্থানীয় এক মসজিদের ইমাম| তারা ছিলেন তিন ভাই এবং বোন। তার সহোদর তিন ভাই ও দুই বোনের নাম হল: সবার বড় কাজী সাহেবজান, কনিষ্ঠ কাজী আলী হোসেন, বোন উম্মে কুলসুম। কাজী নজরুল ইসলামের ডাক নাম ছিল "দুখু মিয়া"| তিনি স্থানীয় মক্তবে (মসজিদ পরিচালিত মুসলিমদের ধর্মীয় স্কুল) কুরআন, ইসলাম ধর্ম , দর্শন এবং ইসলামী ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন শুরু করেন। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে যখন তার পিতার মৃত্যু হয়, তখন তার বয়স মাত্র নয় বছর। পারিবারিক অভাব অনটনের কারণে তাঁর শিক্ষা বাধাগ্রস্থ হয় এবং মাত্র দশ বছর বয়সে তাকে নেমে যেতে হয় জীবিকা অর্জ্জনে। এসময় নজরুল মক্তব থেকে নিম্ন মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উক্ত মক্তবেই শিক্ষকতা শুরু করেন। একই সাথে হাজী পালোয়ানের কবরের সেবক এবং মসজিদের মুয়াজ্জিন (আযান দাতা) হিসেবে কাজ শুরু করেন। এইসব কাজের মাধ্যমে তিনি অল্প বয়সেই ইসলাম ধর্মের মৌলিক আচার অনুষ্ঠানের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হবার সুযোগ পান যা তার পরবর্তী সাহিত্যকর্মকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করেছে। তিনিই বাংলা সাহিত্যে ইসলামী চেতনার চর্চা শুরু করেছেন বলা যায়।
মক্তব, মসজিদ ও মাজারের কাজে নজরুল বেশি দিন ছিলেননা। বাল্য বয়সেই লোকশিল্পের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে একটি লেটো (বাংলার রাঢ় অঞ্চলের কবিতা, গান ও নৃত্যের মিশ্র আঙ্গিক চর্চার ভ্রাম্যমান নাট্যদল) দলে যোগ দেন। তার চাচা কাজী বজলে করিম চুরুলিয়া অঞ্চলের লেটো দলের বিশিষ্ট ওস্তাদ ছিলেন এবং আরবি, ফারসি ও উর্দূ ভাষায় তার দখল ছিল। এছাড়া বজলে করিম মিশ্র ভাষায় গান রচনা করতেন। ধারণা করা হয় বজলে করিমের প্রভাবেই নজরুল লেটো দলে যোগ দিয়েছিলেন। এছাড়া ঐ অঞ্চলের জনপ্রিয় লেটো কবি শেখ চকোর (গোদা কবি) এবং কবিয়া বাসুদেবের লেটো ও কবিগানের আসরে নজরুল নিয়মিত অংশ নিতেন। লেটো দলেই সাহিত্য চর্চা শুরু হয়। এই দলের সাথে তিনি বিভিন্ন স্থানে যেতেন, তাদের সাথে অভিনয় শিখতেন এবং তাদের নাটকের জন্য গান ও কবিতা লিখতেন। নিজ কর্ম ববং অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বাংলা এবং সংস্কৃত সাহিত্য অধ্যয়ন শুরু করেন। একইসাথে হিন্দু ধর্মগ্রন্থ অর্থাৎ পুরাণসমূহ অধ্যয়ন করতে থাকেন। সেই অল্প বয়সেই তার নাট্যদলের জন্য বেশকিছু লোকসঙ্গীত রচনা করেন। এর মধ্যে রয়েছে চাষার সঙ, শকুনীবধ, রাজা যুধিষ্ঠিরের সঙ, দাতা কর্ণ, আকবর বাদশাহ, কবি কালিদাস, বিদ্যাভূতুম, রাজপুত্রের গান, বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ এবং মেঘনাদ বধ। একদিকে মসজিদ, মাজার ও মক্তব জীবন, অপর দিকে লেটো দলের বিচিত্র অভিজ্ঞতা নজরুলের সাহিত্যিক জীবনের অনেক উপাদান সরবরাহ করেছে।নজরুল কালীদেবিকে নিয়ে প্রচুর শ্যামা সঙ্গিত ও রচনা করেন , নজরুল তার শেষ ভাষনে উল্লেখ্য করেন - “ কেউ বলেন আমার বানী যবন কেউ বলেন কাফের। আমি বলি ও দুটোর কোনটাই না। আমি শুধু হিন্দু মুসলিম কে এক জায়গায় ধরে নিয়ে হ্যান্ডশেক করানোর চেষ্টা করেছি, গালাগালি কে গলাগলি তে পরিণত করার চেষ্টা করেছি। ”
১৯১০ সালে নজরুল লেটো দল ছেড়ে ছাত্র জীবনে ফিরে আসেন। লেটো দলে তার প্রতিভায় সকলেই যে মুগ্ধ হয়েছিল তার প্রমাণ নজরুল লেটো ছেড়ে আসার পর তাকে নিয়ে অন্য শিষ্যদের রচিত গান: "আমরা এই অধীন, হয়েছি ওস্তাদহীন / ভাবি তাই নিশিদিন, বিষাদ মনে / নামেতে নজরুল ইসলাম, কি দিব গুণের প্রমাণ"| এই নতুন ছাত্রজীবনে তার প্রথম স্কুল ছিল রানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুল| এর পর ভর্তি হন মাথরুন উচ্চ ইংরেজি স্কুলে যা পরবর্তীতে নবীনচন্দ্র ইনস্টিটিউশন নামে পরিচিতি লাভ করে। মাথরুন স্কুলের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক ছিলেন কুমুদরঞ্জন মল্লিক যিনি সেকালের বিখ্যাত কবি হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। তার সান্নিধ্য নজরুলের অনুপ্রেরণার একটি উৎস। কুমুদরঞ্জন স্মৃতিচারণ করতে যেয়ে নজরুল সম্বন্ধে লিখেছেন,
ছোট সুন্দর ছনমনে ছেলেটি, আমি ক্লাশ পরিদর্শন করিতে গেলে সে আগেই প্রণাম করিত। আমি হাসিয়া তাহাকে আদর করিতাম। সে বড় লাজুক ছিল।
যাহোক, আর্থিক সমস্যা তাকে বেশী দিন এখানে পড়াশোনা করতে দেয়নি। ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার পর তাকে আবার কাজে ফিরে যেতে হয়। প্রথমে যোগ দেন বাসুদেবের কবিদলে। এর পর একজন খ্রিস্টান রেলওয়ে গার্ডের খানসামা এবং সবশেষে আসানসোলের চা-রুটির দোকানে রুটি বানানোর কাজ নেন। এভাবে বেশ কষ্টের মাঝেই তার বাল্য জীবন অতিবাহিত হতে থাকে। এই দোকানে কাজ করার সময় আসানসোলের দারোগা রফিজউল্লাহ'র' সাথে তার পরিচয় হয়। দোকানে একা একা বসে নজরুল যেসব কবিতা ও ছড়া রচনা করতেন তা দেখে রফিজউল্লাহ তার প্রতিভার পরিচয় পান। তিনিই নজরুলকে ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালের দরিরামপুর স্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি করে দেন। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি আবার রানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুলে ফিরে যান এবং সেখানে অষ্টম শ্রেণী থেকে পড়াশোনা শুরু করেন। ১৯১৭ সাল পর্যন্ত এখানেই পড়াশোনা করেন। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের শেষদিকে মাধ্যমিকের প্রিটেস্ট পরীক্ষার না দিয়ে তিনি সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে যোগ দেন। এই স্কুলে অধ্যয়নকালে নজরুল এখানকার চারজন শিক্ষক দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। এরা হলেন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের সতীশচন্দ্র কাঞ্জিলাল, বিপ্লবী চেতনা বিশিষ্ট নিবারণচন্দ্র ঘটক, ফারসি সাহিত্যের হাফিজ নুরুন্নবী এবং সাহিত্য চর্চার নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

 সৈনিক জীবন


সেনাবাহিনীতে নজরুল
১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের শেষদিকে নজরুল সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। প্রথমে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে এবং পরবর্তীতে প্রশিক্ষণের জন্য সীমান্ত প্রদেশের নওশেরায় যান। প্রশিক্ষণ শেষে করাচি সেনানিবাসে সৈনিক জীবন কাটাতে শুরু করেন। তিনি সেনাবাহিনীতে ছিলেন ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের শেষভাগ থেকে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রায় আড়াই বছর। এই সময়ের মধ্যে তিনি ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাধারণ সৈনিক থেকে কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার পর্যন্ত হয়েছিলেন। উক্ত রেজিমেন্টের পাঞ্জাবী মৌলবির কাছে তিনি ফারসি ভাষা শিখেন। এছাড়া সহসৈনিকদের সাথে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র সহযোগে সঙ্গীতের চর্চা অব্যাহত রাখেন, আর গদ্য-পদ্যের চর্চাও চলতে থাকে একই সাথে। করাচি সেনানিবাসে বসে নজরুল যে রচনাগুলো সম্পন্ন করেন তার মধ্যে রয়েছে, বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী (প্রথম গদ্য রচনা), মুক্তি (প্রথম প্রকাশিত কবিতা); গল্প: হেনা, ব্যথার দান, মেহের নেগার, ঘুমের ঘোরে, কবিতা সমাধি ইত্যাদি। এই করাচি সেনানিবাসে থাকা সত্ত্বেও তিনি কলকাতার বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকার গ্রাহক ছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে প্রবাসী, ভারতবর্ষ, ভারতী, মানসী, মর্ম্মবাণী, সবুজপত্র, সওগাত এবং বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা। এই সময় তার কাছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং ফারসি কবি হাফিজের কিছু বই ছিল। এ সূত্রে বলা যায় নজরুলের সাহিত্য চর্চার হাতেখড়ি এই করাচি সেনানিবাসেই। সৈনিক থাকা অবস্থায় তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেন। এ সময় নজরুলের বাহিনীর ইরাক যাবার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধ থেমে যাওয়ায় আর যাননি। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে যুদ্ধ শেষ হলে ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভেঙে দেয়া হয়। এর পর তিনি সৈনিক জীবন ত্যাগ করে কলকাতায় ফিরে আসেন।





সাংবাদিক জীবন ও বিয়ে
যুদ্ধ শেষে কলকাতায় এসে নজরুল ৩২ নং কলেজ স্ট্রিটে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে বসবাস শুরু করেন। তার সাথে থাকতেন এই সমিতির অন্যতম কর্মকর্তা মুজফ্‌ফর আহমদ। এখান থেকেই তার সাহিত্য-সাংবাদিকতা জীবনের মূল কাজগুলো শুরু হয়। প্রথম দিকেই মোসলেম ভারত, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, উপাসনা প্রভৃতি পত্রিকায় তার কিছু লেখা প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে রয়েছে উপন্যাস বাঁধন হারা এবং কবিতা বোধন, শাত-ইল-আরব, বাদল প্রাতের শরাব, আগমনী, খেয়া-পারের তরণী, কোরবানি, মোহরর্‌ম, ফাতেহা-ই-দোয়াজ্‌দম্‌। এই লেখাগুলো সাহিত্য ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। এর প্রেক্ষিতে কবি ও সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার মোসলেম ভারত পত্রিকায় তার খেয়া-পারের তরণী এবং বাদল প্রাতের শরাব কবিতা দুটির প্রশংসা করে একটি সমালোচনা প্রবন্ধ লিখেন। এ থেকেই দেশের বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সমালোচকদের সাথে নজরুলের ঘনিষ্ঠ পরিচয় শুরু হয়। বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে কাজী মোতাহার হোসেন, মোজাম্মেল হক, কাজী আবদুল ওদুদ, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌, আফজালুল হক প্রমুখের সাথে পরিচয় হয়। তৎকালীন কলকাতার দুটি জনপ্রিয় সাহিত্যিক আসর গজেনদার আড্ডা এবং ভারতীয় আড্ডায় অংশগ্রহণের সুবাদে পরিচিত হন অতুলপ্রসাদ সেন, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী, শিশির ভাদুড়ী, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নির্মেলন্দু লাহিড়ী, ধুর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, হেমেন্দ্রকুমার রায়, দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, ওস্তাদ করমতুল্লা খাঁ প্রমুখের সাথে। ১৯২১ সালের অক্টোবর মাসে তিনি শান্তিনিকেতনে যেয়ে রবীন্দ্রনাথের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তখন থেকে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু পর্যন্ত তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় ছিল। কাজী মোতাহার হোসেনের সাথে নজরুলের বিশেষ বন্ধুত্ব গড়ে উঠে।

তরুণ নজরুল
১৯২০ খ্রিস্টাব্দের জুলাই ১২ তারিখে নবযুগ নামক একটি সান্ধ্য দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হওয়া শুরু করে। অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে প্রকাশিত এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন শেরে-বাংলা এ.কে. ফজলুল হক। এই পত্রিকার মাধ্যমেই নজরুল নিয়মিত সাংবাদিকতা শুরু করেন। ঐ বছরই এই পত্রিকায় "মুহাজিরীন হত্যার জন্য দায়ী কে?" শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেন যার জন্য পত্রিকার জামানত বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং নজরুলের উপর পুলিশের নজরদারী শুরু হয়। যাই হোক সাংবাদিকতার মাধ্যমে তিনি তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পান। একইসাথে মুজফ্‌ফর আহমদের সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা-সমিতিতে যোগদানের মাধ্যমে রাজনীতি বিষয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পেয়েছিলেন। বিভিন্ন ছোটখাটো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কবিতা ও সঙ্গীতের চর্চাও চলছিল একাধারে। তখনও তিনি নিজে গান লিখে সুর দিতে শুরু করেননি। তবে ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গীতজ্ঞ মোহিনী সেনগুপ্তা তার কয়েকটি কবিতায় সুর দিয়ে স্বরলিপিসহ পত্রিকায় প্রকাশ করছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে: হয়তো তোমার পাব দেখা, ওরে এ কোন স্নেহ-সুরধুনী। সওগাত পত্রিকার ১৩২৭ বঙ্গাব্দের বৈশাখ সংখ্যায় তার প্রথম গান প্রকাশিত হয়। গানটি ছিল: "বাজাও প্রভু বাজাও ঘন"। ১৯২১ সালের এপ্রিল-জুন মাসের দিকে নজরুল মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে গ্রন্থ প্রকাশক আলী আকবর খানের সাথে পরিচিত হন। তার সাথেই তিনি প্রথম কুমিল্লার বিরজাসুন্দরী দেবীর বাড়িতে আসেন। আর এখানেই পরিচিত হন প্রমীলা দেবীর সাথে যার সাথে তার প্রথমে পরিণয় ও পরে বিয়ে হয়েছিল। তবে এর আগে নজরুলের বিয়ে ঠিক হয় আলী আকবর খানের ভগ্নী নার্গিস আসার খানমের সাথে। বিয়ের আখত সম্পন্ন হবার পরে কাবিনের নজরুলের ঘর জামাই থাকার শর্ত নিয়ে বিরোধ বাধে। নজরুল ঘর জামাই থাকতে অস্বীকার করেন এবং বাসর সম্পন্ন হবার আগেই নার্গিসকে রেখে কুমিল্লা শহরে বিরজাসুন্দরী দেবীর বাড়িতে চলে যান। তখন নজরুল খুব অসুস্থ ছিলেন এবং প্রমিলা দেবী নজরুলের পরিচর্যা করেন। এক পর্যায়ে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

 বিদ্রোহী নজরুল

তখন দেশজুড়ে অসহযোগ আন্দোলন বিপুল উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। নজরুল কুমিল্লা থেকে কিছুদিনের জন্য দৌলতপুরে আলী আকবর খানের বাড়িতে থেকে আবার কুমিল্লা ফিরে যান ১৯ জুনে। এখানে যতদিন ছিলেন ততদিনে তিনি পরিণত হন একজন সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মীতে। তার মূল কাজ ছিল শোভাযাত্রা ও সভায় যোগ দিয়ে গান গাওয়া। তখনকার সময়ে তার রচিত ও সুরারোপিত গানগুলির মধ্যে রয়েছে "এ কোন পাগল পথিক ছুটে এলো বন্দিনী মার আঙ্গিনায়, আজি রক্ত-নিশি ভোরে/ একি এ শুনি ওরে/ মুক্তি-কোলাহল বন্দী-শৃঙ্খলে" প্রভৃতি। এখানে ১৭ দিন থেকে তিনি স্থান পরিবর্তন করেছিলেন। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে আবার কুমিল্লায় ফিরে যান। ২১ নভেম্বর ছিল সমগ্র ভারতব্যাপী হরতাল। এ উপলক্ষে নজরুল আবার পথে নেমে আসেন; অসহযোগ মিছিলের সাথে শহর প্রদক্ষিণ করেন আর গান করেন, "ভিক্ষা দাও! ভিক্ষা দাও! ফিরে চাও ওগো পুরবাসী"। নজরুলের এ সময়কার কবিতা, গান ও প্রবন্ধের মধ্যে বিদ্রোহের ভাব প্রকাশিত হয়েছে। এর সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে বিদ্রোহী নামক কবিতাটি। বিদ্রোহী কবিতাটি ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় এবং সারা ভারতের সাহিত্য সমাজে খ্যাতিলাভ করে। এই কবিতায় নজরুল নিজেকে বর্ণনা করেন -
আমি বঞ্চিত ব্যথা পথবাসী চির গৃহহারা যত পথিকের,
আমি অবমানিতের মরম বেদনা, বিষ জ্বালা, চির লাঞ্ছিত বুকে গতি ফের
আমি অভিমানী চির ক্ষুব্ধ হিয়ার কাতরতা, ব্যথা সুনিবিড়,
চিত চুম্বন-চোর-কম্পন আমি থর-থর-থর প্রথম প্রকাশ কুমারীর !
আমি গোপন প্রিয়ার চকিত চাহনি, ছল করে দেখা অনুখন,
আমি চপল মেয়ের ভালবাসা তার কাকন চুড়ির কন-কন ।
...
আমি বসুধা-বক্ষে আগ্নেয়াদ্রি, বাড়ব বহ্নি, কালানল,
আমি পাতালে মাতাল অগ্নিপাথার কলরোল কলকোলাহল ।
আমি তড়িতে চড়িয়া উড়ে চলি জোর তুড়ি দিয়া দিয়া লম্ফ,
আমি ত্রাস সঞ্চারী ভুবনে সহসা সঞ্চারী ভূমিকম্প ।
...
আমি চির বিদ্রোহী বীর -
বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির উন্নত শির !
১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ১২ই আগস্ট নজরুল ধূমকেতু পত্রিকা প্রকাশ করে। এটি সপ্তাহে দুবার প্রকাশিত হতো। ১৯২০-এর দশকে অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলন এক সময় ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এর পরপর স্বরাজ গঠনে যে সশস্ত্র বিপ্লববাদের আবির্ভাব ঘটে তাতে ধূমকেতু পত্রিকার বিশেষ অবদান ছিল। এই পত্রিকাকে আশীর্বাদ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন,
কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু, আয় চলে আয়রে ধূমকেতু।
আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু, দুর্দিনের এই দুর্গশিরে উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।
পত্রিকার প্রথম পাতার শীর্ষে এই বাণী লিখা থাকতো। পত্রিকার ২৬ সেপ্টেম্বর, ১৯২২ সংখ্যায় নজরুলের কবিতা আনন্দময়ীর আগমনে প্রকাশিত হয়। এই রাজনৈতিক কবিতা প্রকাশিত হওয়ায় ৮ নভেম্বর পত্রিকার উক্ত সংখ্যাটি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। একই বছরের ২৩ নভেম্বর তার যুগবাণী প্রবন্ধগ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং একই দিনে তাকে কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর তাকে কুমিল্লা থেকে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়। ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ৭ জানুয়ারি নজরুল বিচারাধীন বন্দী হিসেবে আত্মপক্ষ সমর্থন করে এক জবানবন্দী প্রদান করেন। চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট সুইনহোর আদালতে এই জবানবন্দী দিয়েছিলেন। তার এই জবানবন্দী বাংলা সাহিত্যে রাজবন্দীর জবানবন্দী নামে বিশেষ সাহিত্যিক মর্যাদা লাভ করেছে। এই জবানবন্দীতে নজরুল বলেছেন:
আমার উপর অভিযোগ, আমি রাজবিদ্রোহী। তাই আমি আজ রাজকারাগারে বন্দি এবং রাজদ্বারে অভিযুক্ত।... আমি কবি,আমি অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তিদানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত। কবির কণ্ঠে ভগবান সাড়া দেন, আমার বাণী সত্যের প্রকাশিকা ভগবানের বাণী। সেবাণী রাজবিচারে রাজদ্রোহী হতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারে সে বাণী ন্যায়দ্রোহী নয়, সত্যাদ্রোহী নয়। সত্যের প্রকাশ নিরুদ্ধ হবে না। আমার হাতের ধূমকেতু এবার ভগবানের হাতের অগ্নি-মশাল হয়ে অন্যায় অত্যাচার দগ্ধ করবে...।
১৬ জানুয়ারি বিচারের পর নজরুলকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। নজরুলকে আলিপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। এখানে যখন বন্দী জীবন কাটাচ্ছিলেন তখন (১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি ২২) বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ তার বসন্ত গীতিনাট্য গ্রন্থটি নজরুলকে উৎসর্গ করেন। এতে নজরুল বিশেষ উল্লসিত হন। এই আনন্দে জেলে বসে আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কবিতাটি রচনা করেন।

 অসুস্থতা


১৯৪০ সালে ৪২ বছর বয়সী নজরুল
নবযুগে সাংবাদিকতার পাশাপাশি নজরুল বেতারে কাজ করছিলেন। এমন সময়ই অর্থাৎ ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েস। এতে তিনি বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন। তার অসুস্থতা সম্বন্ধে সুষ্পষ্টরুপে জানা যায় ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে। এরপর তাকে মূলত হোমিওপ্যাথি এবং আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা করানো হয়। কিন্তু এতে তার অবস্থার তেমন কোন উন্নতি হয়নি। সেই সময় তাকে ইউরোপে পাঠানো সম্ভব হলে নিউরো সার্জারি করা হত। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে তা সম্ভব হয়ে উঠেনি। ১৯৪২ সালের শেষের দিকে তিনি মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেন। এরপর নজরুল পরিবার ভারতে নিভৃত সময় কাটাতে থাকে। ১৯৫২ সাল পর্যন্ত তারা নিভৃতে ছিলেন। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে কবি ও কবিপত্নীকে রাঁচির এক মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয়। এই উদ্যোগে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল নজরুলের আরোগ্যের জন্য গঠিত একটি সংগঠন যার নাম ছিল নজরুল চিকিৎসা কমিটি। এছাড়া তৎকালীন ভারতের বিখ্যাত রাজনীতিবিদ শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি সহযোগিতা করেছিলেন। কবি চার মাস রাঁচিতে ছিলেন।
এরপর ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে নজরুল ও প্রমীলা দেবীকে চিকিৎসার জন্য লন্ডন পাঠানো হয়। মে ১০ তারিখে লন্ডনের উদ্দেশ্যে হাওড়া রেলওয়ে স্টেশন ছাড়েন। লন্ডন পৌঁছানোর পর বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তার রোগ নির্ণয়ের চেষ্টা করেন। এদের মধ্যে ছিলেন: রাসেল ব্রেইন, উইলিয়াম সেজিয়েন্ট এবং ম্যাককিস্ক। তারা তিনবার নজরুলের সাথে দেখা করেন। প্রতিটি সেশনের সময় তারা ২৫০ পাউন্ড করে পারিশ্রমিক নিয়েছিলেন। রাসেল ব্রেইনের মতে নজরুলের রোগটি ছিল দুরারোগ্য বলতে গেলে আরোগ্য করা ছিল ছিল অসম্ভব। একটি গ্রুপ নির্ণয় করেছিল যে নজরুল "ইনভল্যুশনাল সাইকোসিস" রোগে ভুগছেন। এছাড়া কলকাতায় বসবাসরত ভারতীয় চিকিৎসকরাও আলাদা একটি গ্রুপ তৈরি করেছিলেন। উভয় গ্রুপই এই ব্যাপারে একমত হয়েছিল যে, রোগের প্রাথমিক পর্যায়ের চিকিৎসা ছিল খুবই অপ্রতুল ও অপর্যাপ্ত। লন্ডনে অবস্থিত লন্ডন ক্লিনিকে কবির এয়ার এনসেফালোগ্রাফি নামক এক্স-রে করানো হয়। এতে দেখা যায় তার মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব সংকুচিত হয়ে গেছে। ড: ম্যাককিস্কের মত বেশ কয়েকজন চিকিৎসক একটি পদ্ধতি প্রয়োগকে যথোপযুক্ত মনে করেন যার নাম ছিল ম্যাককিস্ক অপারেশন। অবশ্য ড: ব্রেইন এর বিরোধিতা করেছিলেন।
এই সময় নজরুলের মেডিকেল রিপোর্ট ভিয়েনার বিখ্যাত চিকিৎসকদের কাছে পাঠানো হয়। এছাড়া ইউরোপের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানেও পাঠানে হয়েছিল। জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসার্জন অধ্যাপক রোঁয়েন্টগেন ম্যাককিস্ক অপারেশনের বিরোধিতা করেন। ভিয়েনার চিকিৎসকরাও এই অপারেশনের ব্যাপারে আপত্তি জানান। তারা সবাই এক্ষেত্রে অন্য আরেকটি পরীক্ষার কথা বলেন যাতে মস্তিষ্কের রক্তবাহগুলির মধ্যে এক্স-রেতে দৃশ্যমান রং ভরে রক্তবাহগুলির ছবি তোলা হয় (সেরিব্রাল অ্যানজিওগ্রাফি)। কবির শুভাকাঙ্খীদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক তাকে ভিয়েনার চিকিৎসক ডঃ হ্যান্স হফের অধীনে ভর্তি করানো হয়। এই চিকিৎসক নোবেল বিজয়ী চিকিৎসক জুলিয়াস ওয়েগনার-জাউরেগের অন্যতম ছাত্র। ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের ৯ ডিসেম্বর কবিকে পরীক্ষা করানো হয়। এর ফলাফল থেকে ড. হফ বলেন যে, কবি নিশ্চিতভাবে পিক্‌স ডিজিজ নামক একটি নিউরন ঘটিত সমস্যায় ভুগছেন। এই রোগে আক্রান্তদের মস্তিষের ফ্রন্টাল ও পার্শ্বীয় লোব সংকুচিত হয়ে যায়। তিনি আরও বলেন বর্তমান অবস্থা থেকে কবিকে আরোগ্য করে তোলা অসম্ভব। ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের ২৭ ডিসেম্বর তারিখে কলকাতার দৈনিক যুগান্তর পত্রিকা ভিয়েনায় নজরুল নামে একটি প্রবন্ধ ছাপায় যার লেখক ছিলেন ডঃ অশোক বাগচি। তিনি উচ্চ শিক্ষার জন্য ভিয়েনায় অবস্থান করছিলেন এবং নজরুলের চিকিৎসা সম্বন্ধে প্রত্যক্ষ জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। যাহোক, ব্রিটিশ চিকিৎসকরা নজরুলের চিকিৎসার জন্য বড় অংকের ফি চেয়েছিল যেখানে ইউরোপের অন্য অংশের কোন চিকিৎসকই ফি নেননি। অচিরেই নজরুল ইউরোপ থেকে দেশে ফিরে আসেন। এর পরপরই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ডঃ বিধান চন্দ্র রায় ভিয়েনা যান এবং ড. হ্যান্স হফের কাছে বিস্তারিত শোনেন। নজরুলের সাথে যারা ইউরোপ গিয়েছিলেন তারা সবাই ১৯৫৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর রোম থেকে দেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।

 বাংলাদেশে আগমন ও প্রয়াণ


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশে অন্তিম শয়নে কবি নজরুল ইসলাম
১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাঙালিদের বিজয় লাভের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মে তারিখে ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে কবি নজরুলকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান এক্ষেত্রে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কবির বাকি জীবন বাংলাদেশেই কাটে। বাংলা সাহিত্য এবং সংস্কৃতিতে তার বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরুপ ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দের ৯ ডিসেম্বর তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধিতে ভূষিত করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমাবর্তনে তাকে এই উপাধি প্রদান করা হয়। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ সরকার কবিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করে। একই বছরের ২১ ফেব্রুয়ারিতে তাকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। একুশে পদক বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্মানসূচক পদক হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।
এরপর যথেষ্ট চিকিৎসা সত্ত্বেও নজরুলের স্বাস্থ্যের বিশেষ কোন উন্নতি হয়নি। ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে কবির সবচেয়ে ছোট ছেলে এবং বিখ্যাত গিটার বাদক কাজী অনিরুদ্ধ মৃত্যুবরণ করে। ১৯৭৬ সালে নজরুলের স্বাস্থ্যেরও অবনতি হতে শুরু করে। জীবনের শেষ দিনগুলো কাটে ঢাকার পিজি হাসপাতালে। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের ২৯ আগস্ট তারিখে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কবি তার একটি কবিতায় বলেছিলেন:
পূজিছে গ্রন্থ ভন্ডের দল মূর্খরা সব শোন/ মানুষ এনেছে গ্রন্থ, গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোন

তিনি কালীদেবিকে নিয়ে অনেক শ্যামা সঙ্গিত রচনা করেন , ইসলামী গজলও রচনা করেন । নজরুল তার শেষ ভাষনে উল্লেখ্য করেছেন - কেউ বোলে আমা এই কবিতায় তার অন্তিম ইচ্ছা প্রকাশ পেয়েছে। তার এই ইচ্ছার বিষয়টি বিবেচনা করে কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাধিস্থ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এবং সে অনুযায়ী তাঁর সমাধি রচিত হয়। তার জানাজার নামাযে ১০ হাজারের মত মানুষ অংশ নেয়। জানাজা নামায আদায়ের পর রাষ্ট্রপতি সায়েম, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, রিয়াল এডমিরাল এম এইচ খান, এয়ার ভাইস মার্শাল এ জি মাহমুদ, মেজর জেনারেল দস্তগীর জাতীয় পতাকা মন্ডিত নজরুলের মরদেহ সোহরাওয়ার্দী ময়দান থেকে বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ প্রাঙ্গনে নিয়ে যান।  বাংলাদেশে তাঁর মৃত্যু উপলক্ষ্যে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় শোক দিবস পালিত হয়। আর ভারতের আইনসভায় কবির সম্মানে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।

সাহিত্যকর্ম

 কবিতাঃ

১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে কুমিল্লা থেকে কলকাতা ফেরার পথে নজরুল দুটি বৈপ্লবিক সাহিত্যকর্মের জন্ম দেন। এই দুটি হচ্ছে বিদ্রোহী কবিতা ও ভাঙ্গার গান সঙ্গীত। এগুলো বাংলা কবিতা ও গানের ধারাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল। বিদ্রোহী কবিতার জন্য নজরুল সবচেয়ে বেশী জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। একই সময় রচিত আরেকটি বিখ্যাত কবিতা হচ্ছে কামাল পাশা। এতে ভারতীয় মুসলিমদের খিলাফত আন্দোলনের অসারতা সম্বন্ধে নজরুলে দৃষ্টিভঙ্গি এবং সমকালীন আন্তর্জাতিক ইতিহাস-চেতনার পরিচয় পাওয়া যায়। ১৯২২ সালে তার বিখ্যাত কবিতা-সংকলন অগ্নিবীণা প্রকাশিত হয়। এই কাব্যগ্রন্থ বাংলা কবিতায় একটি নতুনত্ব সৃষ্টিতে সমর্থ হয়, এর মাধ্যমেই বাংলা কাব্যের জগতে পালাবদল ঘটে। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে এর প্রথম সংস্করণ শেষ হয়ে গিয়েছিল। পরপর এর কয়েকটি নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এই কাব্যগ্রন্থের সবচেয়ে সাড়া জাগানো কবিতাগুলোর মধ্যে রয়েছে: "প্রলয়োল্লাস, আগমনী, খেয়াপারের তরণী, শাত-ইল্‌-আরব, বিদ্রোহী, কামাল পাশা" ইত্যাদি। এগুলো বাংলা কবিতার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

 সঙ্গীতঃ

গদ্য রচনা, গল্প ও উপন্যাস

নজরুলের প্রথম গদ্য রচনা ছিল "বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী"। ১৯১৯ সালের মে মাসে এটি সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সৈনিক থাকা অবস্থায় করাচি সেনানিবাসে বসে এটি রচনা করেছিলেন। এখান থেকেই মূলত তার সাহিত্যিক জীবনের সূত্রপাত ঘটেছিল। এখানে বসেই বেশ কয়েকটি গল্প লিখেছেন। এর মধ্যে রয়েছে: "হেনা, ব্যাথার দান, মেহের নেগার, ঘুমের ঘোরে"। ১৯২২ সালে নজরুলের একটি গল্প সংকলন প্রকাশিত হয় যার নাম ব্যথার দান। এছাড়া একই বছর প্রবন্ধ-সংকলন যুগবাণী প্রকাশিত হয়।

রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দর্শন

সৈনিক জীবন ত্যাগ করে নজরুল বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে মুজফ্‌ফর আহমদের সাথে বাস করছিলেন। মুজফ্‌ফর আহমদ ছিলেন এদেশে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন প্রতিষ্ঠার অগ্রদূত। এখান থেকেই তাই নজরুলের রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ শুরু হয়। মুজফ্‌ফর আহমদের সাথে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা-সমিতি ও বক্তৃতায় অংশ নিতেন। এ সময় থেকেই সমাজতান্ত্রিক আদর্শের সাথে পরিচিত হন। ১৯১৭ সালে রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব তাকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। তার লাঙ্গল ও গণবাণী পত্রিকায় তিনি প্রকাশ করেন সাম্যবাদীসর্বহারা কবিতাগুচ্ছ। এরই সাথে প্রকাশ করেছিলেন কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল-এর অনুবাদ জাগ অনশন বন্দী ওঠ রে যত। তার পত্রিকায় প্রকাশিত হয় রেড ফ্ল্যাগ-এর অবলম্বনে রচিত রক্তপতাকার গান
তখন মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন এবং মাওলানা মোহাম্মদ আলী ও শওকত আলীর নেতৃত্বে খিলাফত আন্দোলন। অসহযোগ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল শান্তিপূর্ণ উপায়ে ভারতবর্ষ থেকে ইংরেজদের বিতারণ। আর খিলাফত আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল তুরস্কে মধ্যযুগীয় সামন্ত শাসন ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা, কারণ এই সমন্বিত সুলতানী শাসন ব্যবস্থার প্রধান তথা তুরস্কের সুলতানকে প্রায় সকল মুসলমানরা মুসলিম বিশ্বের খলীফা জ্ঞান করতো। নজরুল এই দুটি আন্দোলনের আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে স্বাধীনতা তথা স্বরাজ অর্জনে বিশ্বাস করতেন যা মহাত্মা গান্ধীর দর্শনের বিপরীত ছিল। আবার মোস্তফা কামাল পাশার নেতৃত্বে তুরস্কের সালতানাত উচ্ছেদের মাধ্যমে নতুন তুরস্ক গড়ে তোলার আন্দোলনের প্রতি নজরুলের সমর্থন ছিল। তারপরও তিনি অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলন যোগ দিয়েছিলেন। এর কারণ, এই সংগ্রাম দুটি ভারতীয় হিন্দু মুসলমানদের সম্মিলিত সম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল।
তবে সব দিক বিচারে নজরুল তার রাষ্ট্রীয় ধ্যান ধারণায় সবচেয়ে বেশী প্রভাবিত হয়েছিলেন কামাল পাশার দ্বারা। কারণ কামাল পাশা তুরস্কে সামন্ততান্ত্রিক খিলাফত তথা সালতানাত উচ্ছেদ করে দেশটিকে একটি আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তুরস্কবাসীদের জীবন থেকে মৌলবাদ ও পর্দাপ্রথা দূর করতে পেরেছিলেন বলেই নজরুল তার প্রতি সবচেয়ে আকৃষ্ট হয়েছিলেন বলে অনেক বিশেষজ্ঞ(অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম)মত প্রকাশ করেছেন।নজরুল ভেবেছিলেন তুরস্কের মুসলমানরা তাদের দেশে যা করতে পেরেছে ভারতীয় উপমহাদেশে কেন তা সম্ভব হবেনা? গোড়ামী, রক্ষণশীলতা, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে নজরুলের অবস্থান ছিল কঠোর। আর তার এই অবস্থানের পিছনে সবচেয়ে বড় প্রভাব ছিল কামাল পাশার। সে হিসেবে তার জীবনের নায়ক ছিলেন কামাল পাশা। নজরুলও তার বিদ্রোহী জীবনে অনুরুপ ভূমিকা পালনের প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। উল্লেখ্য ১৯২১ সনের সেপ্টেম্বর মাসে মুজফ্‌ফর আহমদ ও নজরুল তালতলা লেনের যে বাসায় ছিলেন সে বাড়িতেই ভারতের প্রথম সমাজতান্ত্রিক দল গঠিত হয়েছিল। ১৯১৭ সনের রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমেও নজরুল প্রভাবিত হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি নিজে কখনই এই দলের সদস্য হননি, যদিও কমরেড মুজফ্‌ফর তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন আজীবন।
১৯২০ এর দশকের জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে তিনি অংশ গ্রহণের চেষ্টা করেন। প্রথমে কংগ্রেসে সমর্থন লাভের জন্য তিনি কলকাতা যান। কিন্তু কংগ্রেসের কাছ থেকে তেমন সাড়া না পেয়ে তিনি একাই নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেন।নির্বাচনে তিনি তেমন সাফল্য পাননি। এরপর সাহিত্যের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক চিন্তার বহিপ্রকাশ অব্যাহত থাকলেও রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ কমে যায়।

 সমালোচনা

  • মলয় রায়চৌধুরী রচিত উনিশতম অশ্বারোহীঃ নজরুল সম্পর্কে একটো পোস্টমডার্ন প্রতর্ক'। মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা, ঢাকা ( ২০০০ )।

সম্মান

কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয়। তাঁর রচিত "চল চল চল, ঊর্ধগগনে বাজে মাদল" বাংলাদেশের রণসংগীত হিসাবে গৃহীত। নজরুরের জন্ম ও মৃত্যু বার্ষিকী প্রতি বছর বিশেষভাবে উদযাপিত হয়। নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালে (বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায়) ২০০৫ সালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় নামক সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে কবির জন্মস্থান চুরুলিয়ায় নজরুল অ্যাকাডেমি ও বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় কবির স্মৃতিতে নজরুল একাডেমী, বুলবুল ললিতকলা একাডেমী ও শিশু সংগঠন বাংলাদেশ নজরুল সেনা স্থাপিত হয়। এছাড়া সরকারীভাবে স্থাপিত হয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান নজরুল ইন্সটিটিউট কলকাতায় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও মূল শহরের সংযোগকারী প্রধান রাস্তাটি কবির নামে উৎসর্গ করে কাজী নজরুল ইসলাম সরণি করা হয়। এছাড়াও কলকাতা মেট্রোর গড়িয়া বাজার স্টেশনটিকে কবির সম্মানে কবি নজরুল নামে উৎসর্গ করা হয়েছে। ঢাকা শহরের একটি প্রধান সড়কের নাম রাখা হয়েছে কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ।

উইকিপিডিয়া থেকে নেয়া


উপনিবেশোত্তর আফ্রিকান সাহিত্য


একটি দেশে উপনিবেশ গড়বার পর আধিপত্যবাদী শক্তি যা যা করে আফ্রিকার ক্ষেত্রেও সেটার কিছুমাত্র কম হয়নি। আধিপত্যবাদী শক্তি অধীন-দেশের সবচেয়ে স্পর্শকাতর এবং গুরুত্বপূর্ণ সত্তা, সংস্কৃতির একেবারে গোড়ায় আঘাত হানে। শুধু সেটাই নয়, পুরো দেশের রাজনীতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক কাঠামো আগ্রাসী শক্তির কাঠামো কর্তৃক প্রতিস্থাপিত হয়, শিক্ষাব্যবস্থা হয়ে পড়ে স্থানীয় সমাজবিচ্ছিন্ন। ইতিহাস আমাদের এই শিক্ষা দেয়। ইতিহাস আমাদের এও জানান দেয় যে, কর্তৃত্বের পরাজয় একদিন ঘটে, কিন্তু ধর্ষণের পর যদি ধর্ষিতা গর্ভবতী হয়ে পড়ে তখন ধর্ষণের কষ্ট ছাপিয়ে যেমন আরো তীব্র হয় ধর্ষণের ফল টানার লাঞ্ছনা, তেমনই আধিপত্যবাদ নিজের পরাজয়ের আগে অধীন দেশের গর্ভে দিয়ে যায় পররমুখাপেক্ষী-অর্থনৈতিক কাঠামো, নিজের পছন্দ মতো তাঁবেদার স্থানীয় শাসক, সমাজ বাস্তবতা বর্জিত শিক্ষাব্যবস্থা এবং শ্রেণীবৈষম্যের বীজ। কালে কালে সেই পাপের ফল টানতে হয় ধর্ষিতা ভূখণ্ডকে। আফ্রিকার ক্ষেত্রে এসব জানবার জন্য ইতিহাস জানার প্রয়োজন সীমিত, তাদের সাহিত্য বরং আমাদের সাহায্য করবে ইতিহাস আসলে কেমন হয় সেটা জানতে।
আফ্রিকান সাহিত্যিকদের সৃষ্টিকর্মের দার্শনিক-সমাজতাত্ত্বিক আলোচনা ব্যাপক ভাবে করেছেন রডনি, ক্যাবরাল এবং গুগি। তাঁরা খুব চমতকার ভাবে রাজনীতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিয়েছেন কিভাবে এগুলো আফ্রিকার সাহিত্যিকদের চেতনাকে জারিত করেছে। আর এভাবে তাঁরা আফ্রিকার সাহিত্য সৃষ্টি-পরিচিতির পেছনকার মানসগঠন এবং চিন্তাচেতনার ধারা সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। পাশাপাশি ঔপন্যাসিকদের সমাজগঠন চিত্রণে আফ্রিকার সামাজিক সম্পর্ক, রাজনীতিক বিন্যাস এবং অর্থনৈতিক বিষয়াশয় সদস্যরূপে এসেছে কিনা সে-সম্পর্কে সিদ্ধান্তে আসার ক্ষেত্রেও পাঠকদের এ-কাজগুলো সহযোগিতা করবে। আফ্রিকার সাহিত্যের সংজ্ঞা নির্ধারনী বিতর্কেও এ-সমালোচনাগুলো কাজে আসবে। কেননা যে, এগুলো আফ্রিকার সাহিত্যের প্রাক-উপনিবেশ, উপনিবেশ এবং উত্তর-উপনিবেশ ধাপগুলোর ঐতিহাসিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছে, যাতে করে আফ্রিকার সাহিত্যের বিশ্লেষণের কাজটি সহজ হয়।
রডনি, ক্যাবরাল এবং গুগি দাবি করেন যে, আফ্রিকার সাহিত্যের একটি ঐতিহাসিক ধারা আছে। উদাহরণ দিয়েছেন এইভাবে নয়াউপনিবেশবাদ এখনো আফ্রিকাতে আছে এইজন্য যে, ঔপনিবেশিককালে প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক, রাজনীতিক এবং সামাজিক ধারাগুলো স্বাধীনতা পরবর্তী সময়েও বর্তমান। নয়া উপনিবেশবাদের বোঝাপড়া এবং একে চ্যালেঞ্জ করবার জন্য ঔপনিবেশিক যুগের প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক, রাজনীতিক এবং সামাজিক পরস্পর বিরোধিতাগুলোর বিশ্লেষণ জরুরি। কেননা ওই বৈপরিত্যসমূহ আজও আফ্রিকার সমাজের নির্মম বাস্তবতা। রডনির মতে উপনিবেশবাদই আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কাছে আফ্রিকার অর্থনীতিকে নির্ভরশীল করে নয়াউপনিবেশবাদের শিকড় তৈরি করে দিয়ে গেছে। উতপাদন এবং বণ্টনের পুঁজিবাদী সম্পর্ক, যেমন, ইণ্টারন্যাশনাল ট্রেড কমোডিটি এক্সচেঞ্জ সিস্টেমস এণ্ড ভ্যালুজ, এ-পরমূখিতার সৃষ্টি করেছে। রডনি বলছেন, উপনিবেশবাদ কোনোরকম ক্ষতিপূরণ ছাড়াই আফ্রিকার উন্নয়নকে করেছে স্থুল, খণ্ডিত এবং পশ্চাতমুখী।
আফ্রিকান সাহিত্যে এইসব শোষণের এবং পুঁজিবাদি অর্থনীতির প্রবেশের নান্দনিক উপস্থাপন আছে, এভাবে না বলে বলা ভালো সাহিত্যের ওইসব নান্দনিক চিত্রণ থেকেই এসব আলোচনা হয়েছে, সম্ভব হয়েছে। রডনি কিছু উদাহরণ দিয়েছেন। যেমন, মেয়মবিতে আছে, আমার জমি কফিতে ভরপুর অথচ বাবা আমার গরিব চাষি ছিলেন চিরকাল...। দেম্বসএ আছে- অনেক ধনের মাঝে লোক বাঁচে দীনহীন হালে। সর্বত্র কফি আর কফি, গাছে গাছে বিপুল সম্ভারে। ওরা দাম দিয়ে ওইসব চুরি করেছিলো, ঘামের দাম দিয়েছে অথর্ব পয়সা দিয়ে। (পেপেটেলা:১৯৮৬:১৮/১৫৬)
ফার্দিনান্দ ওয়োনোর দ্য ওল্ড ম্যান এণ্ড দ্য মেডেল এর মূলচরিত্র মেকা এবং অন্যান্য চাষিরা, যারা নারকেল ফলিয়েছে ফ্রান্সে রপ্তানি করবার জন্য। চিনুয়া আসিবির থিংস ফল্ অ্যাপার্টএ বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন এবং মিষ্টিআলু বিক্রয় পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রবেশ নির্দেশ করে। একইভাবে মঙ্গো বেটির মিশন টু কালা, দ্য পুওর ক্রাইস্ট অব বোমবা এণ্ড কিং ল্যাজারাস-এ রপ্তানী উদ্দেশ্যে নারকেল উতপাদন আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রবেশ নির্দেশ করে, আফ্রিকার জন্য যা অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। উপনিবেশ যুগের মেরুকরণ আফ্রিকার উতপাদন ব্যবস্থাকে পুঁজিবাদের মুখাপেক্ষী করে নিঃস্ব করে দিয়েছে। স্থানীয় কলকারখানার উন্নতি হয়েছে যতসামান্য (যা আজো বর্তমান)। আই উইল ম্যারি হোয়েন আই ওয়াণ্ট -এ গিকামবা বলছেন: ‘সবকিছু মেনে নেবো গিথোনির ছেলে/ শ্রমঘাম বেচে তাও/ গাঁয়ের কিছুটা যদি উন্নতি হয়/ আহারে! দেখো তো গাঁয়ের একি হাল।
রডনি উল্লেখ করেন, রাস্তাগুলো তৈরি করা হয়েছিলো ওদের ব্যবসার সুবিধার্থে আর যুক্তি দেখানÑআফ্রিকার স্বার্থে যদিবা কিছু গিয়ে থাকে সেটা নেহাতই অনিচ্ছাকৃত, দুর্ঘটনাবশত। উদাহরণস্বরূপ মঙ্গো বেটির রিমেম্বার রুবেন-এ ভাষ্যকার বলছেন, রাস্তাগুলো কোনোভাবেই আমাদের ইচ্ছাতে তৈরি হয়নি, ওগুলো আমাদের দুনিয়া থেকে ঢের বেশি দূরে। ফার্দিনান্দ ওয়োনোর দ্য ওল্ড ম্যান এণ্ড দ্য মেডেল-এ ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর খাটিয়ে কালোশ্রমে রাস্তা নির্মাণ আফ্রিকাতে ইওরোপের শোষণেরই চিত্রণ। রডনি আরো উল্লেখ করেন যে, উপনিবেশ যুগে দখলদাররা নিজেদের মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখবার জন্য যেসব সামাজিক সেবা দিয়েছে সেগুলো তাদের শোষণ এবং আধিপত্যের ধরণের বহিঃপ্রকাশ। মেয়মবি -তে ভাষ্যকার বলছেন,সারাদিন কুড়ালে কাঠ কেটে তুমি পাচ্ছো বিশ পয়সা... আর তোমার মালিক কতো পাচ্ছে জানো? এককাঁড়ি টাকা। এই টাকা আয়ের জন্য তোমার মালিক কী করেছে? কিছুই না, একদম কিচ্ছু না... তো সে কিভাবে দিনে হাজার হাজার আয় করবে আর তোমাকে দেবে মাত্র বিশ পয়সা? কী অধিকার তার আছে? এটাই ঔপনিবেশিক শোষণ।(পেপেটেলা: ১৯৮৩: ১৯)
রডনি দাবি করছেন এভাবেই আফ্রিকার উন্নয়নের পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
রডনি লক্ষ্য করেছেন যে, আফ্রিকার এই ইওরোপ মুখাপেক্ষিতাই সৃষ্টি করেছে নয়াঔপনিবেশিক শ্রেণীবৈষম্য আর সেই আফ্রিকান শ্রেণী যারা ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক কাঠামোকে তাদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। মিশন টু কালা তে ঔপনিবেশিক প্রভুরা ভিমিলাই এর প্রধানকে নির্বাচিত করে এবং সে জণগনের জীবনের দামে যাপন করতো এক অভিজাত জীবন।ঔপনিবেশিক প্রভুরা (যারা তাকে নির্বাচিত করেছিলো) ওর মুখে মাখন তুলে দিয়েছিলো। এর বিনিময়ে সে রোবটের মতো তাদের নির্দেশ পালন করতো আর জানতো যে, তারা ওকে জঞ্জালে ফেলে দেবে না। যখন জোর করে খাটিয়ে কাজ করানো হচ্ছিলো তখন সবাই ওকে ভয় করে চলতো, কেননা ও ছিলো দলচ্যুত আর শত্রুপক্ষের গোয়েন্দা। ও নিজের স্বার্থের প্রয়োজনে আমাদের প্রথাগত চেইন অব কমাণ্ড মেনে চলতো, আর ওর প্রয়োজন না হলে নির্দ্বিধায় ওসব ভঙ্গ করতো ।(বেটি: ১৯৬৪: ১৮)
কালা- কেন্দ্রিয় চরিত্র সমাজকে ধ্বংস করার জন্য ঔপনিবেশিক প্রভুদের হয়ে কাজ করতো। অভাবী ঋণগ্রস্তদের কাছ থেকে টাকা আর গবাদি নিয়ে ধনী বনে যান মেদজা-র বাবা। মেদজা-র মতে ইনিই হচ্ছেন আফ্রিকার বুদ্ধিজীবির জগতে পশ্চিমা ভণ্ডামি এবং ব্যবসায়িক বাস্তুববাদের স্বার্থক প্রতিস্থাপকের পরাকাষ্ঠা। এই পেটি-বুর্জোয়া আর শিক্ষিত কালো শ্রেণীই নয়াউপনিবেশবাদের ভিত্তি স্থাপন করেছে।
উপনিবেশযুগের শিক্ষাপদ্ধতি কিভাবে আফ্রিকানদেরকে উপনিবেশ ব্যবস্থার তাঁবেদার বানিয়েছে রডনি সে সম্পর্কে বিশদ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলছেন, নয়া উপনিবেশবাদের সূচনা যে শ্রেণীবৈষম্য দিয়ে সেটার শুরু হয়েছে শিক্ষার সংগে বস্তুগত প্রাপ্তির সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। রডনি বিশেষভাবে বলতে চান যে, একটি সমাজের বাসিন্দাদের জীবন এবং সে সমাজের অবকাঠামো রক্ষার জন্য শিক্ষা অতিঅবশ্য জরুরি। উপনিবেশপূর্ব যুগের আফ্রিকার শিক্ষাপদ্ধতির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক এই যে, শিক্ষার সংগে আফ্রিকার জনগণের সম্পর্ক, যেটা উপনিবেশ যুগে হয়েছে ঠিক তার উল্টো। উপনিবেশ যুগের শিক্ষাপদ্ধতির একটাই উদ্দেশ্য পুরো মহাদেশের উপর আধিপত্য কায়েমের ক্ষেত্রে আফ্রিকানদেরকে সংশ্লিষ্ট করার জন্য এদেরকে উপযুক্ত করে গড়ে তোলা। ঔপনিবেশিক শিক্ষার শিক্ষা হচ্ছে তাঁবেদার হবার শিক্ষা, শোষণের শিক্ষা, মানসিক সংশয়-সংকটের সৃষ্টি আর অনুন্নয়ন।
মিশন টু কালা তে, মেদজা-র ঔপনিবেশিক শিক্ষা তাকে রাজনীতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত সরকারি চাকুরের জীবন এনে দেয়, ফলে ঐ দেশের জনগণের সম্পূর্ণ স্বার্থবিরোধী কাজ করতেও এতটুকু কষ্ট হয় না। ঔপনিবেশিক শিক্ষা এইভাবে অভিজাত কালোশ্রেণী তৈরি করেছে যেন স্বাধীনতা পরবর্তী সময়েও তার রাজনীতিক এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ পুরোপুরি অক্ষুন্ন থাকে।
রডনি আরো লক্ষ্য করেছেন যে, ঔপনিবেশিক শক্তি একটা বিরোধী অভিজাত শ্রেণী তৈরি করেছে যা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ওখানে সামরিক একনায়কতন্ত্রের শাসন কায়েম করেছে। আসিবির অ্যানথিলস অব সাভানাহ- র সামরিক একনায়ক স্যাম এক্ষেত্রে খুব ভালো উদাহরণ।
রডনি আরো প্রত্যক্ষ করেছেন, শিক্ষিত আফ্রিকানরা উপমহাদেশে সবচেয়ে বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। শিক্ষার প্রতিটি স্তরে তারা আরও বেশি করে জর্জরিত হয়েছে এবং সাদা পুঁজিবাদের প্রতি অনুরক্ত হয়েছে, মোটা অংকের মজুরি পেয়ে ভিনদেশী জীবনযাপন পদ্ধতিতে আসক্ত হয়ে পড়েছে। পরবর্তীতে যা তাদের মানসকিতাকেই পাল্টে ফেলেছে।
ঔপনিবেশিক শিক্ষা আফ্রিকানদের চিন্তা-চেতনার জগতকে কলুষিত করার চাইতেও বেশি যে-ক্ষতি করেছে সেটা হলো অস্বাভাবিক জটিলতা-আক্রান্ত করে তাদেরকে অ-আফ্রিকান করে ফেলেছে এবং নিজস্ব পারিপার্শ্বিকতা থেকে আরো আরো বিচ্ছিন্ন করেছে। নিজের সমাজজীবন এবং উন্নয়নের পথে যে-দিক নির্দেশনার প্রয়োজন, আফ্রিকান বুদ্ধিজীবিদের সে শক্তি পুরোপুরি কেড়ে নিয়েছে ঔপনিবেশিক শিক্ষা। উদাহরণ স্বরূপ দাম্বুজো ম্যারেশেরার হাউজ অব হাঙ্গার-র কথক সাংস্কৃতিকভাবে বিচ্ছিন্ন কেননা সে পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত। মিশন টু কালা-মেদজা-র রোল মডেল আমেরিকা। নিজের সমাজোপযোগি কোনো সিদ্ধান্ত সে নিতে পারে না, এমনকি আফ্রিকার সমাজসংশ্লিষ্ট কোনো নতুন দৃষ্টিভঙ্গিও তার নেই। 'তো আমার ধারনা আরো বেশি বোধগম্য করার উদ্দেশ্যে উদাহরণ দিয়ে ওদের সামনে তুলে ধরবো বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। আশ্চর্য যে, আমি ওইসব সাধারণ মানুষকে নিউইয়র্ক সম্পর্কে বলতে লাগলাম... নিউইয়র্ক সম্পর্কে বলাটা একটা ছেলেমানুষি ছাড়া আর কিছুই না, কেননা যে ওটা সম্পর্কে আমার যতটা জ্ঞান তা ওই সিনেমা দেখেই।'(বেটি: ১৯৬৪: ৬৫)
ঔপনিবেশিক শিক্ষা মেদজাকে যা যা শিখিয়েছে সবই আফ্রিকার সমাজ বহির্ভূত। চার্লস মঙ্গোশির ওয়েটিং ফর দ্য রেইন-লুসিফারও ঔপনিবেশিক শিক্ষার ফলে নিজের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতা অনুভব করে। পি’বিটেক একটা চিত্রকল্প এঁকেছেন যেখানে ঔপনিবেশিক শিক্ষা আফ্রিকান অভিজাতদের খোজা করে দিয়েছে: ‘আমার স্বামীর ঘর অন্ধকার বইয়ের জঙ্গল.../ তাদের পুরুষত্ব শ্রেণীকক্ষেই নিঃশেষিত, বড় বড় বই ওদের অণ্ডকোষ পিষে ফেলেছে।’(পি’বিটেক: ১৯৮৫: ১১৭)
গুগি লক্ষ্য করেছেন ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং আফ্রিকার বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণেই জনগণ বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। আর সে কারণেই নিগ্রো কবিরা সবসময়েই বিচ্ছিন্নতাবিরোধী থেকেছেন আফ্রিকার পরিচয়, আফ্রিকান মূল্যবোধ এবং আফ্রিকার শেকড় সংশ্লিষ্ট থেকে। পাগলের মতো খুঁজেছেন তাঁদের হারানো পরিচয়, হারানো আফ্রিকান ঐতিহ্য। লিয়ন দুমাস লেখেন, ‘(শাদারা) আমার জায়গাটুকু চুরি করেছিলো। চিকায়া উতামসি বর্ণনা করেছেন (শাদারা কালোদেরকে ফেলে গেছে) অন্ধকার কোনো এক কোণে... চলে গেছে সেই দেবী একদা যে নেচেছিলো গেয়েছিলো বনে... মহান পশ্চিম টাকা দিয়ে বেঁধেছে আমায়... আমার যেসব ছিলো হারিয়েছে সব চিরতরে।
ধর্মের ব্যবহার উপনিবেশবাদের ধর্ম। আফ্রিকাতে হয়েছে খ্রিস্টধর্মের ব্যবহার । রডনি খ্রিস্টানধর্ম, ঔপনিবেশিক শিক্ষাপদ্ধতি এবং প্রশাসনিক পদ্ধতির আন্তঃসম্পর্ক নিয়েও বিশ্লেষণ করেছেন। হোমকামিং এ গুগি বলছেন, গ্রহণযোগ্যতা অর্জন এবং চিরস্থায়ী করবার জন্য ঔপনিবেশিকরা খ্রিস্টধর্মের সেবা দিয়েছে আর শিক্ষাকে করেছে খ্রিস্টধর্ম ভিত্তিক... মন এবং আত্মা দুটোকেই গ্রাস করার জন্য... (১৯৮২)। আসিবির থিংস ফল অ্যাপার্ট-এ নতুন ধর্মান্তরিত খ্রিস্টানরা তাদের চিরাচরিত জীবনযাপন পদ্ধতি পাল্টে ঔপনিবেশিকতাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো। ওয়োনোর দ্য ওল্ডম্যান এণ্ড দ্য মেডেল - মেকা তার সমস্ত সম্পত্তি পাদরিকে দান করেঃ ‘আর এখন সে থাকে খ্রিস্টান গোরস্তানের পাদদেশে অবস্থিত একটা হতদরিদ্র গ্রাম্যকুটিরে যার নামও দেয়া হয়েছে মিশনারিরই নামে’।(ওয়োনো: ১৯৬৭: ৯)
হাউজবয়- ঔপনিবেশিক গির্জাপ্রধান ফাদার গিলবার্ট এর পক্ষে গিয়ে নিজের জন্মদাতাকেই অস্বীকার করে টুণ্ডি। বেটির পুওর ক্রাইস্ট অব বোমবা এণ্ড কিং ল্যাজারাসএ ফাদার ড্রুমণ্ট এবং ফাদার লি গুয়েন খ্রিস্টধর্মকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে স্থানীয় জনগণের ওপর পুরো কর্তৃত্ব নিয়ে নেয়, আর এভাবে শোষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। আই উইল ম্যারি হোয়েন আই ওয়াণ্ট -এ গিকামবা বলেন, ‘স্রষ্টা আর ধর্ম এক জিনিস নয়।/ ১৮৯৫এ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা যখন এখানে আসে/ সব গির্জার সব পাদরির/ বাম হাতে ছিলো বাইবেল/ আর ডান হাতে রাইফেল/ সাদারা চেয়েছে/ মাতাল করতে ধর্ম দিয়ে/ আর তেনারা এইসময়ে/ নকশা এবং দখল করছে আমার জমি/ কারখানা আর ব্যবসা ফাঁদছে আমার ঘামে।’ (গুগি: ১৯৮২: ৫৬-৭)
আধিপত্যবাদ যে-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালিয়েছে সে বিষয়ে আলোচনা করেছেন ক্যাবরাল। তাঁর মতে আদর্শ এবং মতবাদের পর্যায়ে অর্থনৈতিক এবং রাজনীতিক কার্যাবলীর চূড়ান্ত ফলাফলই হচ্ছে সংস্কৃতি। একটা সমাজের উতপাদনীশক্তির পর্যায় এবং এই-উতপাদনের ওপর আধিপত্য বিস্তারই ধর্মই হচ্ছে সংস্কৃতির ভিত্তি।ফলে সমাজে বিদ্যমান সম্পর্কগুলোর একদিকে মানুষ (ব্যষ্টিক এবং সামষ্টিক) ও প্রকৃতির সম্পর্ক, অন্যদিকে ব্যক্তিগত দলগত এবং বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে সম্পর্ক, গতিশীল প্রকাশ এবং বিভিন্ন রাজনীতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সজাগ সচেতনতার ফলই সংস্কৃতি (ক্যাবরাল: ১৯৮০: ১৪১)।
সংস্কৃতি কেবল তখনই গতিশীল হবে যখন সামাজিক উন্নয়নের প্রক্রিয়াটি নিরবচ্ছিন্ন থাকবে এবং ভিনদেশী আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটা শক্ত স্থায়ী দেয়াল দাঁড় করানো যাবে।
ঔপনিবেশিক শক্তি আঘাত করেছে স্বদেশি সংস্কৃতির একেবারে মূলে। এবং আফ্রিকার সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ও এর বহিঃপ্রকাশের পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। ওয়োনোর হাউজবয়-টুণ্ডি (যে ফাদারের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে নিজের জন্মদাতাকে অস্বীকার করেছিলো) প্রশ্ন করছে, ‘আমাদের (কালোদের) কে ফরাসি ডাকলেই কী!’ এপ্রশ্ন সে করে যখন সে বুঝতে পারে তার এই ফরাসি পরিচিতি তাকে প্রকারান্তরে ঔপনিবেশিক সংস্কৃতি ও শোষকের পরিচয়ে পরিচিত করায়।
উপনিবেশবাদ যেমন করে শোষিতের ইতিহাসকে উপেক্ষা করার মাধ্যমে তাদের সংস্কৃতির পথকে রুদ্ধ করে দেয় তেমনই স্বাধীনতাযুদ্ধও শোষকের সংস্কৃতিকে অস্বীকার করার মাধ্যমে আসলে শোষকের ক্ষমতার বিরুদ্ধে এক মহাহুঙ্কার ক্যাবরাল। অতএব সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রথম ধাপ হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী সংস্কৃতি পরিহার করে নিজের সংস্কৃতি অন্বেষণ। আফ্রিকার সংস্কৃতির বিদেশি রূপান্তরে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে পুঁজিবাদি অর্থনীতির প্রবেশ, বুর্জোয়া ধর্ম এবং ইওরোপিয়ান শিক্ষাপদ্ধতি। আর এ-বিষয়গুলো খুব সুন্দরভাবে উপস্থাপিত হয়েছে তালা এবং এসাজাম উপন্যাস দুটিতে। ঔপনিবেশিক শক্তি কর্তৃক স্বদেশি সংস্কৃতির বিপর্যয়ের চিত্র অংকিত হয়েছে ওয়োনোর হাউজবয় এবং দ্য ওল্ড ম্যান এণ্ড দ্য মেডেল -এ। আর এর বিপরীতে উপনিবেশবাদ দিয়েছে স্কুল, দোকানপাট, রাস্তা, হাসপাতাল যাতে করে আফ্রিকার সংস্কৃতির স্থান দখল করতে পারে ঔপনিবেশিক সংস্কৃতি। ক্যাবরাল বলছেন,‘নিজেদের সংস্কৃতির দীর্ঘ নিরাপত্তার স্বার্থেই ঔপনিবেশিক শক্তি শোষিতের সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। ক্যাবরাল দেখিয়েছেন যে, এ-সংস্কৃতি স্বপ্ন দেখিয়েছে যে পেটি বুর্জোয়া শ্রেণীকে তারা এ-সমাজেরই বাসিন্দা। আফ্রিকার নতুন শাসক গোষ্ঠী অনুন্নত, অর্থনৈতিক ক্ষমতা নুন্যতম। এরা নিজেদেরকে ঔপনিবেশিক শক্তির সংগে একীভূত করে সাংস্কৃতিকভাবে মহত্তম ভাবতে শুরু করে। তাদের এই কৃত্রিম সংস্কৃতি রাজনীতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে পুরোপুরি বুর্জোয়া সংস্কৃতির উপর নির্ভরশীল। যালা এবং লাস্ট এম্পায়ারএ উসমান সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের ব্যাপক সমালোচনা করেছেন। উসমান তাঁর যালা (খোজা/পুরুষত্বহীন) তে এল হাজি কাদের বে-র পুরুষত্বহীনতার মধ্য দিয়ে আফ্রিকার নতুন মধ্যবিত্ত শাসকদের উদ্ভাবনীশক্তির অপর্যাপ্ততা এবং অর্থনৈতিক পঙ্গুত্বকেই ইঙ্গিত করেছেন। হাজি চেম্বার অব কমার্সকে বলছে: আমরা ব্যবসায়ী? ফু! শিশুর পায়ে বাপের জুতার মতো... ঝুড়ির মধ্যে কাঁকড়াবিছার মতো। আমরা কি আগের শাসকদের জায়গা দখল করতে চাই? ... কী পরিবর্তনটা হয়েছে শুনি, সাধারণ বা বিশেষ কিছু? ঔপনিবেশিক শক্তির বীজ আমাদের মধ্যে আজও আছে... আমরা কী! এজেণ্ট! পেটি ব্যবসায়ী! নির্বোধের মতো আমরা আমাদেরকে ভাবছি ব্যবসায়ী! মূলধন ছাড়া ব্যবসায়ী।(উসমান: ১৯৭৬: ৯১-২)
পূর্ববর্তী প্রজন্ম যে-বিদেশি আধিপত্যবাদী সংস্কৃতি থেকে মুক্তির উদ্দেশে লড়েছিলো নতুন প্রজন্ম সে-সংস্কৃতিকেই আঁকড়ে ধরেছে। ছেঁড়া হোক আর আধুনিক হোক ইওরোপের বসন-বাসন ব্যবহারকেই আফ্রিকানরা ইওরোপিয়ানদের সমতুল্য হবার মাধ্যম হিসেবে নিয়েছে, নিজেদের প্রাপ্তি মনে করেছে অধ্যাপক ওয়েস্টারম্যান (আফ্রিকান টুডে: ৩৩১)। আর এগুলোর চমতকার চিত্রণ উসমান এর দ্য লাস্ট এম্পায়ার (ইওরোপ আমেরিকার কাপড়ের প্রতি ম্যামলেট সুকুবের তীব্র টান), কিংবা ওয়োনোর দ্য ওল্ড ম্যান এণ্ড দ্য মেডেল (ইওরোপিয়ান জুতা জ্যাকেটের প্রতি মেকার আগ্রহ)। ডেভিল অন দ্য ক্রস -এ গুগি ব্যঙ্গ করেছেন যা বিদেশি তা-ই শ্রেষ্ঠ, দেশি মাত্রই অপকৃষ্ট, এই হচ্ছে নতুন মধ্যবিত্তশ্রেণীর মানসিকতা (আমাদের দেশেও সচরাচর আমরা কেনাকাটার সময় জিনিসটা বাইরের বললে নিশ্চিন্ত এবং প্রীত হই)। মধ্যবিত্ত শাসক শ্রেণীর আরো যে-বিষয়টা গুগি চিত্রিত করেছেন সেটা হচ্ছে এ-শ্রেণী নিজস্ব বিপ্লবী সংস্কৃতিটাকে আর লালন করতে নারাজ, কেননা যে ওরা নিজেরাই এখন শোষকের স্থান দখল করেছে এবং এই অবস্থানের পরিবর্তন ওরা চায় না। এই শিল্পিত চিত্রণের সংগে মিল পাওয়া যায় ক্যাবরালর বিশ্লেষণের সংস্কৃতির এই শ্রেণীচরিত্র বুঝিয়ে দিচ্ছে যে জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের মূল্যায়ন দুই শ্রেণীর কাছে সম্পূর্ণ বিপরীত, একের কাছে অত্যাবশ্যকীয়, অন্যের কাছে অপ্রয়োজনীয়। জাতীয় উন্নয়নের শক্তির স্বাধীনতার ধ্বংসাত্মক জবরদখল করে আধিপত্যবাদ, আর জাতীয় স্বাধীনতা সে-উন্নয়নের শক্তিকে বিদেশি সকল অপশক্তি থেকে মুক্তি দেয়। কিন্তু আফ্রিকান সাহিত্যের গোঁড়ার দিকে আইনগত স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক মুক্তির বিষয় দুটোর মৌলিক পার্থক্য নিরুপণে আফ্রিকান সাহিত্যিকগণ সফল হননি। যেমন, আধিপত্যবাদবিরোধী সাহিত্য আসিবির থিংস ফল অ্যাপার্টএ আফ্রিকার মূল সমস্যা শ্রেণী সংঘাত চিহ্নিত না হয়ে হয়েছে বর্ণবৈষম্য। স্বাধীনতা যুদ্ধ আসলে তখনই ফলপ্রসূ যখন আফ্রিকান লেখকরা লিখতে শুরু করেন পেটালস অব ব্লাড (গুগি)র মতো লেখা যেখানে আফ্রিকার মূল সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে শ্রেণীসংঘাত। ক্যাবরাল মনে করেন জাতীয় সংস্কৃতির ধারক কৃষকরাও সংস্কৃতির প্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। উন্নততর সংস্কুতির সংস্পর্শে এই কৃষকরাই ‘পেটি বুর্জোয়া ধ্যান ধারণা ঝেড়ে ফেলে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে পারেন (আমরা রুশ বিপ্লবের কথা এক্ষেত্রে স্মরণ করতে পারি)। এবং বুর্জোয়া শ্রেণীর বিনাশ তখন অনিবার্য, তারা নিজেদের তখন কৃষকশ্রেণীর কাতারে ভাবতে বাধ্য হবে।
এক ইতিহাস গড়েছে আমাদের জাতীয় সশস্ত্র মুক্তি আন্দোলন, আমাদের সংস্কৃতি আর আমাদের আফ্রিকান পরিচয়ের চূড়ান্ত প্রকাশ ক্যাবরাল। ক্যাবরাল আরো বলছেন ‘আমাদের সংস্কৃতি আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলনের সংস্কৃতি। গুগির মাতিগারিতে কেন্দ্রিয় চরিত্র নয়াঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের একজন গেরিলাযোদ্ধা।
গুগির মতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে যেসব আফ্রকান লেখক বেরিয়ে এসেছেন তাঁরা তিনটি ধাপ প্রত্যক্ষ করেছেন। ১. উপনিবেশবিরোধীযুদ্ধ ২. স্বাধীনতা ৩. নয়া উপনিবেশবাদ।
পঞ্চাশের দশকে আফ্রিকার অধিকাংশ দেশই স্বাধীনতা লাভ করে, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী যুদ্ধের জয় হয়। এ-দশকের সাহিত্যিকদের মধ্যে তাই প্রতিশ্র“তি এবং প্রত্যয়ের ছাপ দেখা যায়। জাতিগত মহত্বের দোহাই দিয়ে আধিপত্যবাদী শক্তি নিজের শাসন-শোষণের বৈধতা প্রমাণে সচেষ্ট ছিলো। নতুন আফ্রিকার লেখকগণ নান্দনিক সাহিত্য সৃষ্টি করে দেখিয়ে দিলেন আফ্রিকার ইতিহাস, সংস্কৃতি, সভ্যতা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি অপেক্ষা উন্নততর না হোক অন্তত সমান মানের। লেখকগণ প্রত্যক্ষ করলেন যে, উপনিবেশ যুগের আরোপিত বি-নিগ্রোকরণ এবং শিকড়হীনতার জটিলতা থেকে সমাজ ধীরে ধীরে মুক্ত হচ্ছে। এসময়ের প্রতিনিধিত্বকারী শিল্পসৃষ্টির নমূনা উমোফিয়া (উপনিবেশপূর্ব কালের স্বাধীন এবং প্রগতিশীল সমাজ) ভিত্তিক সাহিত্যকর্ম আসিবির থিংস ফল অ্যাপার্ট। আফ্রিকার শতচ্ছিন্ন ইতিহাস পুনর্গঠনের কাজ করলেও আসিবি একে আদর্শায়িত করেননি। তিনি দেখিয়েছেন উপনিবেশপূর্ব যুগেও আফ্রিকার নিজস্ব স্ববিরোধিতা এবং আত্মিক সংকট ছিলো। আসিবির শৈলী তাঁর সমসাময়িক নিগ্রো লেখক (সেংহর, লেই প্রমুখ)গণের সম্পূর্ণ বিপরীত, যাঁদের শিল্পীত কাজ আফ্রিকাকে আদর্শায়িত করেছে। এ-লেখকদের আদর্শগত সংশ্লিষ্টতা আফ্রিকান জাতীয়তাবাদেরই বহিঃপ্রকাশ। সাম্রাজ্যবাদ এবং তদ্পরবর্তী সামাজিক অবস্থার বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এঁদের ভুল এইযে, শ্রেণীসংঘাত নয় বরং জাতিগত বিভেদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এঁরা আলোচনা করেছেন।
উপনিবেশোত্তর আফ্রিকান সাহিত্যের আরো একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে নিজেদের বিপ্লবাত্মক উদ্দেশ্য সামনে রেখে ইংরেজি ভাষা (লেখ্যরূপ)র খোলনলচে পাল্টে ফেলা। আসিবির থিংস ফল অ্যাপার্ট এবং দ্য অ্যারো অব গড আইবো/ইবো (দক্ষিণ-পূর্ব নাইজেরিয়ান ভাষা) ধাঁচে লেখা। আরো লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে আফ্রিকায় উপন্যাস লেখা হয়েছে একটি শ্রেণীর জন্ম হয়েছে বলে আসিবি, লেই, গুগি এঁরা প্রত্যেকেই নব্য আফ্রিকান শিক্ষিত অভিজাতশ্রেণীর। এঁদের লেখার টার্গেট শ্রেণী ছিলো একই আর্থ-সামাজিক মর্যাদা সম্পন্ন স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক পাঠক-শ্রোতা।
সত্তরের দশকে আফ্রিকা জুড়ে একনায়কতন্ত্রের আবির্ভাব উপনিবেশ যুগের রাজনীতিক অর্থনৈতিক এবং সামাজিক রীতির পুনরাগমণ ঘটায়। তাছাড়া স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে উদ্ভূত নতুন শ্রেণী এবং শ্রেণীর স্ববিরোধিতা ইত্যাদি বিষয় উপনিবেশোত্তর যুগ সম্পর্কে আশাবাদী-সাহিত্যস্রষ্টাদেরকেও হতাশা আক্রান্ত করে। এসময়ের প্রতিনিধিত্বকারী সাহিত্যকর্ম আসিবির আ ম্যান অব দ্য পিপল এবং আরমা দ্য বিউটিফুল ওয়ানস আর নট ইয়েট বর্ন সমাজের বিদ্যমান স্ববিরোধিতাগুলো পুরোপুরি ধরতে পারেনি। ভুলবশতঃ নেতাদের নৈতিক দিকনির্দেশনা প্রদানের অক্ষমতাকে তাঁরা আফ্রিকার মূল সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। লেখকগণ সমাজ এবং নেতৃত্বকে নৈতিক পুনর্জাগরণের মাধ্যমে রূপান্তরের কাজ দায়িত্বজ্ঞান করেন। এসময়ের লেখায় তাই উদার মানবতাবাদী আদর্শের ছাপ দেখা যায়। লেখকগণ নিজেদের লেখার দুঃখ এবং আবেগি শক্তি দ্বারা শোষিতের পক্ষে সমাজের অর্থনৈতিক এবং রাজনীতিক পুনর্বিন্যাসের জন্য শোষকগণের দৃষ্টি আকর্ষণে সচেষ্ট হয়েছেন। উপন্যাসের এই রীতি দ্বারা লেখকরা জনগণের আবেগকে চাবুকাঘাত করেছেন যাতে করে বিদ্যমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের সোচ্চার অবস্থান হয়- এরকমও বলেছেন অনেক সমালোচক। তবে এসময়েই (সত্তরের দশকে) লেখকগণের উপলব্ধি হয় যে সমাজের স্ববিরোধিতগুলোর শিকড় বর্ণবাদে নয় বরং শ্রেণীসংঘাতে। উল্লেখ করবার মতো কাজ গুগির ডেভিল অন দ্য ক্রস, পেপেটেলার মেয়মবি, সালে সেলাসির ফায়ারব্র্যাণ্ডস। এসব উপন্যাসে সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে শ্রেণীসংঘাতের দৃষ্টিকোণ থেকে এবং শোষিতের অর্থাত কৃষক-শ্রমিকের অবস্থান থেকে। লেখকরা জনগণকেই বিপ্লবের ঝাণ্ডা বহনের দায়িত্ব দিয়েছেন। শিক্ষিত অভিজাতশ্রেণীর প্রতি লেখকদের ঘেন্না পরিস্ফুটিত যারা সংগ্রামের সূচনা করতে জানে না, তাঁদের অকুণ্ঠ বিশ্বাস প্রান্তিক কৃষক-শ্রমিকদের ওপর। লেখকরা জনগণকে বিপ্লবী সংগ্রামে উদ্বুদ্ধকরণ নিজেদের দায়িত্ব মনে করেছেন । একটি আগ্রাসী সমাজের সবচেয়ে শোষিত অংশ নারী। দেখা যায় গুগির আ গ্রেইন অব হুয়িট এর মুম্বি, ডেভিল অন দ্য ক্রস এর ওয়ারিংগা, ওয়োনোহাউজবয় এর সোফি এবং উসমান এর যালার আজা আওয়া আসতু এরা সবাই শোষিত নারী। সমাজতান্ত্রিক আদর্শ যদিও এসব লেখার ভিত্তি, তবু শিল্পীত গীতিকবিতা এবং অন্যান্য কথক ভঙ্গিমা নতুন শ্রোতা, কৃষকের উদ্দেশ্যে। এবং শেষোক্ত (কথক ভংগিমা) ধারাটিই বিতর্কের সৃষ্টি করেছে আসলে আফ্রিকান সাহিত্যের মূলধারা কোনটি। ভাষা নিয়েও বিতর্ক আছে। গুগি মনে করেন বিদেশি ভাষায় সাহিত্য রচনা নয়া উপনিবেশবাদের তল্পিবাহক, আর ইংরেজিতে রচিত সকল আফ্রিকান সাহিত্যই প্রকৃতঅর্থে ইওরো-আফ্রিকান, কোনোভাবেই আফ্রিকান নয়। আধিপত্যবাদবিরোধী গুগি তাঁর উপন্যাস ডেভিল অন দ্য ক্রস লিখেছেন গিকুয়্যুতে। এপ্রসংগে তিনি বলছেন, গিকুয়্যুতে লিখলেও অন্যান্য ভাষা থেকে আমি দূরে সরে যাচ্ছি না, কেননা সবসময়েই অনুবাদের সুযোগ থেকেই যাচ্ছে।
এই জায়গাতে এসে আফ্রিকান সাহিত্য নিয়ে ইংরেজিতে কাজ করা বতসোয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মি. ওমোরেগি আপত্তি করছেন গুগি ভুলে যাচ্ছেন যে অনুবাদে সবসময়েই কিছু না কিছু পরিবর্তন, সংযোজন, বর্জন হয় (বলি, সেইজন্য কি মাতৃভাষা বাদ দিয়া অন্যভাষায় সাহিত্য বানাইতে হবে?)। আর তাছাড়া গিকুয়্যুতে লিখলে লেখকের উদ্দিষ্ট স্বদেশি এবং বিদেশি দুইধরনের স্রোতা পেতে সমস্যা হবে। সেক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ভাষা হচ্ছে ইংরেজি। ওদিকে গুগি বলছেন, জনগণের বাঁচার লড়াইয়ে অংশগ্রহণ ভিন্ন আশির দশকের লেখকদের অন্যপথ নাই। এ-অবস্থায় তাকে জনগণের মুখের ভাষার মুখোমুখি হতে হবে যাদের জন্য তার কলম উতসর্গীকৃত। তাকে জনগণের বুলি আর যুদ্ধের ভাষা প্রয়োজনে পুনরাবিস্কার করতে হবে... তাকে হতে হবে জনগণের সংগীতেরই অংশ।
[উপাদানঋণ : আরমা, আসিবি, উতামসি, উসমান, ওয়োনো, ওয়েস্টারম্যান, ওমোরেগি, ক্যাবরাল, গুগি, দুমাস, পেপেটেলা, পি‘বিটেক, মঙ্গো বেটি, মঙ্গোশি, ম্যারেশেরা, রডনি, সালে সেলাসি প্রমুখ।]


লিখেছেনঃ  অবনি অনার্য

 
Design by Amader Design